অনলাইন ডেস্ক
ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নিহত দীপু চন্দ্র দাসকে (২৮) যদি কারখানা কর্তৃপক্ষ পুলিশের হাতে তুলে দিত, তাহলে এমন নির্মম মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো—এমন অভিযোগ করেছেন ময়মনসিংহ জেলা হিন্দু মহাজোটের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নৃপেষ রঞ্জন সরকার।
রোববার (২১ ডিসেম্বর) বিকেল ৪টায় ময়মনসিংহ নগরীর শহীদ ফিরোজ–জাহাঙ্গীর চত্বরে ‘সচেতন সনাতনী সমাজ’-এর ব্যানারে আয়োজিত এক মানববন্ধনে তিনি এসব কথা বলেন। নৃপেষ রঞ্জন সরকার দাবি করেন, ঘটনার সময় পুলিশ প্রস্তুত থাকলেও পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেডের কর্তৃপক্ষ দীপু চন্দ্র দাসকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর না করে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেয়। এর ফলেই এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় কারখানা মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি।
ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন জেলা হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক ডা. এনসি পাল, তারাকান্দা উপজেলা শাখার সভাপতি লিমন দেবনাথ, লিমন পাল, সঞ্জয় দত্ত ও শঙ্কর সাহাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
নিহত দীপু চন্দ্র দাসের প্রতিবেশী লিমন দেবনাথ বলেন, দীপু ছিলেন ঋষি সম্প্রদায়ের একজন শিক্ষিত যুবক এবং তার পরিবারের একমাত্র বিএ পাস করা সদস্য। দেড় বছর আগে তার বিয়ে হয় এবং এক বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। তিনি ব্যক্তিজীবনে সচেতন ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। ধর্ম অবমাননার মতো কাজ তিনি করতে পারেন না বলে দাবি করেন লিমন দেবনাথ। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং নিহতের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
মানববন্ধনে নারায়ণ পাল বলেন, কী অপরাধে দীপু চন্দ্র দাসকে এভাবে হত্যা করা হলো, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের দায়ীদের চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
জেলা হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক ডা. এনসি পাল বলেন, একজন মানুষকে হত্যা করে মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পোড়ানো কোনোভাবেই মানবিক সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এ ঘটনায় জড়িতদের ফাঁসির দাবি জানান তিনি।
মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার প্রায় শতাধিক মানুষ অংশ নেন। তারা ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে দীপু চন্দ্র দাস হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ভালুকার জামিরদিয়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কারখানায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ১৯ ডিসেম্বর নিহতের ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ভালুকা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। সোমবার ভালুকা আমলি আদালতে ওই রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার আদালত পরিদর্শক (ওসি) পীরজাদা শেখ মো. মোস্তাছিনুর রহমান।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অপরাধ সংঘটিত হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। কেন ভুক্তভোগীকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর না করে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হলো, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, এ ঘটনায় র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
নিহতের বাবা রবি চন্দ্র দাস ও বোন চম্পা দাস অভিযোগ করেন, উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে দীপু চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয় এবং তাকে হত্যা করা হয়। তাদের দাবি, দীপু ছিলেন শিক্ষিত ও ধর্মচেতন মানুষ, তিনি কখনো ধর্ম অবমাননা করতে পারেন না।
নিহত দীপু চন্দ্র দাস ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়া কান্দা গ্রামের বাসিন্দা রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি প্রায় দুই বছর ধরে পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেডে কর্মরত ছিলেন।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও অনিয়মের কারণেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিবেশ তৈরি হয়। এসব অভিযোগ তদন্ত করে সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
















Leave a Reply