দুর্গাপূজায় আরেক উৎসব কটিয়াদীর ঢাকের হাট

অনলাইন ডেস্ক

দুর্গাপূজা মানেই উলুধ্বনি, ধুনুচি নাচ আর ঢাক-ঢোলের তাণ্ডব। ষষ্ঠী থেকে বিসর্জন-সব কিছুই অসম্পূর্ণ থেকে যায় ঢাকের আওয়াজ ছাড়া। সেই গুরুত্ব থেকেই কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে প্রায় ৫০০ বছর ধরে বসছে অন্যরকম এক উৎসব- ঢাকের হাট।

ঢাকের তালে উৎসবের রং
শনিবার দুপুর।
কটিয়াদী বাজার এলাকায় ঢাকের হাট জমে উঠেছে। চারদিক থেকে আসছে ঢাক, ঢোল, সানাই, করতাল, বাঁশি, কাঁসি, ঝনঝনি আর মন্দিরার বাজনা। দলে দলে বাদকদল এসেছে দেশের নানা জেলা থেকে। বিক্রমপুর, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ অন্তত ১০টির বেশি জেলা থেকে এসেছে বাদকদল।

বাজনার তালে তালে চলছে প্রতিযোগিতা। কে বাজাবে সবচেয়ে ভালো, কার সুরে বেশি প্রাণ- সেই লড়াই। পাশে দাঁড়িয়ে আয়োজকরা শুনছেন, দেখছেন, পছন্দ করছেন। দরদাম মিললে পছন্দের দলটাই নিয়ে যাচ্ছেন মণ্ডপে।

কেনাবেচা নয়, বাজনার চুক্তি
নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। এই হাট মূলত বাদকদের মঞ্চ। তাঁরা হাটে নিজেদের বাদ্যযন্ত্র বাজান, দেখান দক্ষতা। পূজার আয়োজকরা সেই বাজনা শুনে পছন্দের বাদকদলকে নির্বাচন করেন। দুই পক্ষের সম্মতিতে চূড়ান্ত হয় পারিশ্রমিক।

পূজার দিনগুলোতে সেই দল পূজামণ্ডপে গিয়ে বাজাবে ঢাক, সানাই, কাঁসি কিংবা করতাল।
সম্মানীর খাতায় ঢাকি
হাটে পাওয়া গেল বাজিতপুরের অজিত দাসকে। এক ঢাকির সঙ্গে ১৪ হাজার টাকায় চুক্তি করেছেন তিনি। বললেন, ‘সবার বাজনা শুনেছি। যেটা মন ছুঁয়েছে, তাকেই নিয়েছি।’ নেত্রকোনার বারহাট্টা থেকে রিপন কর্মকার ও সুনীল রবিদাস এসেছেন তাঁদের পূজায় বাদক দল নেবেন বলে। তাঁরা বলেন, ‘এই প্রথম ঢাকের হাটে এসেছি। খুব ভালো লাগছে। চেষ্টা করছি সাধ্যের মধ্যে ভালো একটা দল নিতে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাটে একজনের ঢাকি যেমন আছে, তেমনি দলগত বাজনার দলও রয়েছে। একজন ঢাকির পারিশ্রমিক ১৪-১৫ হাজার টাকা। দলের ক্ষেত্রে তা ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ এমনকি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত যায়।

বিক্রমপু‌রের প‌রিমল দাস বললেন, ২০ বছর ধরে এখানে আসছি। ফোনে চুক্তি করলেও পারতাম, কিন্তু ঢাকের হাটে না এলে মন মানে না।’ তবে তাঁর অভিযোগ, ‘আমরা এদিনটির জন্য অপেক্ষা করি। বাজারে সবকিছুর দাম বেশি। খাটাখাটনির তুলনায় পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না। তবু পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রেখেছি। আগে বাপ-দাদারা আসতেন এখন আমি আসি।’

হাট আছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা দুর্বল
হাটে নেই নির্দিষ্ট জায়গা। নেই খাবার পানি, শৌচাগার, থাকার সুব্যবস্থা। যে যেখানে পারে, বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসেছেন। বৃষ্টিবাদল হলে আশ্রয় নেওয়ার জায়গা নেই। বাদকদ‌লের সদস‌্য সুমন ম‌ণিঋষি বললেন, ‘ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে চাইলে দায়িত্বশীল হতে হয়। অবহেলায় ঐতিহ্য মরে যায়।’

কাপা‌শিয়ার নী‌শিকান্ত দাস ৩০ বছর ধরে কটিয়াদীর ঢাকের হাটে আসছেন। তিনি বললেন, ‘ফোনে ডেকে নিলেও যেতাম, কিন্তু হাটের টান তো অন্যরকম। তাই দলবল নিয়ে চলে এসেছি। এখানে না এলে আনন্দটা পাই না। আর বছরে একবার অনেক বাদকের সঙ্গে দেখা হয়-তখন মনে হয় যেন দেখা হলো স্বজনের সঙ্গে। এবার এক আয়োজক এক লাখ ২০ হাজার টাকা বলেছেন। সম্ভবত তাঁর সঙ্গেই যাব।’

ঢাকের হাটের পেছনের গল্প
স্থানীয় স্বেচ্ছা‌সেবক সংগঠন শ্রী মা সংঘ এই ঢা‌কের হা‌টের তত্ত্বাবধান কর‌ছেন। সংগঠ‌নের সভাপ‌তি শীতল চন্দ্র সাহা জানালেন, এই হাট শুরু হয় ষোড়শ শতকে। সামন্তরাজা নবরঙ্গ রায়ের আমলে। একবার পূজার জন্য সেরা ঢাকি খুঁজতে বিক্রমপুরে বার্তা পাঠান তিনি। নৌকায় ঢাকি আসে কটিয়াদীতে। রাজা নিজে বাজনা শুনে বেছে নেন দল। সেই থেকেই শুরু হয় ঢাকের হাট, যা আজ হয়ে উঠেছে শ্রুতির উৎসব, ছন্দের প্রতিযোগিতা আর সংস্কৃতির মিলনমেলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *