অনলাইন ডেস্ক
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর)। ২০২৩ সালের এই দিনে দক্ষিণ ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাসের আকস্মিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী। সেই হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্তত ৬৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
শুধু বিমান ও স্থল অভিযান নয়, ওই দিন থেকেই গাজা উপত্যকাকে সম্পূর্ণ অবরোধ করে রেখেছে ইসরায়েল। ফলে খাদ্য, পানি, ওষুধ ও ত্রাণের তীব্র ঘাটতিতে ভয়াবহ ক্ষুধা ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ায় শুরু হওয়া এই অভিযানকে ইসরায়েল ‘হামাস নির্মূলের যুদ্ধ’ বলে দাবি করলেও বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞে। দুই বছরের অব্যাহত বোমা হামলায় গাজা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, নিশ্চিহ্ন হয়েছে অসংখ্য বসতি, হাসপাতাল ও স্কুল।
লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক চাথাম হাউসের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সানাম ভাকিল বলেন, ‘দুই বছর ধরে গাজায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ইসরায়েল, কিন্তু তারা কী অর্জন করেছে— তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই যুদ্ধে ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ জোটের কিছু সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, একই সঙ্গে ইসরায়েল নিজেই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকভাবে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।’
ভাকিল আরো বলেন, ‘গাজায় গণহত্যার প্রকৃত চেহারা প্রকাশ পেয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণের ওপর গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করেছে, তাদের এমন এক জীবনযাপনে বাধ্য করেছে যা তাদের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলেছে।
এটি নিঃসন্দেহে জাতিগত নিধনেরই একটি রূপ।’
আইডিএফের অব্যাহত হামলায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি, আহত প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার মানুষ। পাশাপাশি, ফিলিস্তিনকে সমর্থনকারী দেশ ইরান, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন ও কাতারেও একাধিক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল, অনেকদিন ধরেই এ অভিযোগ করে আসছে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। গেল ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনেও তার প্রমাণ মেলে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে নানা সময়ে আলোচনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে ইউরোপসহ পুরো বিশ্ব।
ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা ‘শান্তি প্রস্তাব’ নিয়ে গত রবিবার থেকেই আলোচনা চলছে মিসরে। এ আলোচনার মধ্যেও গাজায় হামলা বন্ধ করেনি ইসরায়েল। হামাস তাদের পক্ষ থেকে শান্তি পরিকল্পনার কিছু অংশে সম্মতি জানিয়েছে। তবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্তে এখনো তাদের প্রতিক্রিয়া আসেনি। যেমন, হামাসের অস্ত্র সমর্পণ এবং গাজায় ভবিষ্যতে সরকারের কোনো ভূমিকায় তাদের অংশগ্রহণ না করা।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কীভাবে মৃতের সংখ্যা গণনা করে?
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের দুই বছরব্যাপী স্থল ও বিমান অভিযানে এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। গত মাস থেকে গাজা সিটিকে ঘিরে ইসরায়েলি হামলা আরো তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে পরামর্শ চললেও ইসরায়েলের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী (৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) নিহতদের মধ্যে ১৯ হাজার ৪২৪ জনই শিশু। যা তখনকার মোট ৬৪ হাজার ২৩২ মৃত্যুর ৩০ শতাংশ। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ১৬০।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বিটসেলেম–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের পর থেকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে যত সংঘর্ষ হয়েছে, তার সবকটির চেয়ে এই যুদ্ধের নিহতের সংখ্যা বহু গুণ বেশি। যুদ্ধের প্রথম দিকে নিহতের সংখ্যা গণনা করা হতো হাসপাতালে আনা মরদেহের ওপর ভিত্তি করে। যেখানে নিহতদের নাম ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যও যুক্ত থাকত।
২০২৪ সালের মে মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অজ্ঞাতনামা মরদেহগুলোকেও পরিসংখ্যানে যুক্ত করে— যা মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল। তবে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে শুধু পরিচয় শনাক্ত মরদেহকেই গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
রয়টার্সের মার্চ মাসের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় ১ হাজার ২০০টিরও বেশি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়েছে— এর মধ্যে একটি পরিবারে ছিলেন ১৪ জন সদস্য।
গাজার মৃত্যুর পরিসংখ্যান কি পূর্ণাঙ্গ?
এই সংখ্যা সব নিহতকে অন্তর্ভুক্ত করে না। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমান, এখনও হাজার হাজার মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। এ ছাড়া উত্তর গাজায় চলমান দুর্ভিক্ষে পুষ্টিহীনতার কারণে মারা যাওয়া ৪৬০ জনকেও সরকারি তালিকায় গণনা করা হয়নি।
চিকিৎসা অবকাঠামোর ধ্বংসের কারণে যুদ্ধের প্রথম ৯ মাসে সরকারি পরিসংখ্যান প্রায় ৪০ শতাংশ কম নিহত দেখিয়েছে বলে দ্য ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত একটি পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ও বলেছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত সংখ্যা সম্ভবত বাস্তবের চেয়ে কম। তাদের নিজস্ব যাচাই পদ্ধতিতে ২০ জুলাই পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের ৪০ শতাংশ শিশু এবং ২২ শতাংশ নারী। গত মাসে জাতিসংঘের এক তদন্তে বলা হয়, গাজায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পরিমাণ ও প্রকৃতি ইসরায়েলের গণহত্যার দায় নির্দেশ করে। ইসরায়েল অবশ্য এই অভিযোগকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও কলঙ্কজনক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
গাজার মৃত্যুর হিসাব কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে গাজায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় উন্নত জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যব্যবস্থা ছিল। জাতিসংঘও প্রায়ই ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে এবং তাদের সংখ্যা ‘বিশ্বাসযোগ্য’ বলে অভিহিত করে।
হামাস কি এসব সংখ্যার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে?
হামাস ২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করছে, তবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিম তীরের রামাল্লাহভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন। গাজার সরকার ২০০৭ সালের পর নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের বেতন দেয়, আর ২০০৭ সালের আগের নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন দেয় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।
ইসরায়েলের অভিযোগ কী?
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেন, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মৃত্যুর সংখ্যা ‘অবিশ্বাস্য’ কারণ হামাস সেখানে সরকার পরিচালনা করে এবং ইচ্ছামতো তথ্য পরিবর্তন করে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হিসাবে, ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর স্থল অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের ৪৬৬ জন সেনা নিহত এবং ২ হাজার ৯৫১ জন আহত হয়েছে। তারা দাবি করে, তারা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে।
















Leave a Reply