শেষ দুটি ডিজিট শুনেই মোবাইলে টাকা পাঠিয়ে দেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মিজান

অনলাইন ডেস্ক

নাম অথবা ফোনের শেষের দুটি ডিজিট শুনেই যেকোনো মোবাইল নম্বরে অনায়াসে টাকা পাঠিয়ে দেন মিজান। বিভিন্ন গ্রাহক ও কোম্পানির ১০ হাজারের বেশি মোবাইল নম্বর মুখস্ত তার। তবে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসায়ী মিজান একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী।

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নের টাঙ্গারিপাড়া গ্রামের দরিদ্র দিনমজুর মনতাজ আলী-মমিনা বেগম দম্পতির দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সন্তান মিজানুর রহমান মিজান। প্রত্যন্ত গ্রামে দিনমজুরি করেই চলত তাদের সংসার। কাজ জুটলে পেট ভাত জুটত না হলে অনাহারে বা অর্ধহারে থাকতে হত পরিবারের ৪ সদস্যের।

এ অবস্থায় অন্ধ মিজান সংসারের হাল ধরতে ২০১৭ সালে শুরু করেন মোবাইল ব্যাংকিং ও বিদ্যুতের পাইপ বিক্রির ব্যবসা। এরপরই দেখা যায়, জন্মান্ধ মিজান যেকোনো মোবাইল নম্বর একবার শুনেই মুখস্ত করে ফেলেন। একই ব্যক্তির কণ্ঠ শুনে কিংবা ফোন নম্বরের শেষের দুটি ডিজিট শুনেই পুরো মোবাইল নম্বর বলে দিতে পারেন তিনি। এভাবেই গ্রাহকের ফ্লেক্সিলোড, মোবাইল ব্যাংকিং এবং বিদ্যুৎ বিল পাঠিয়ে দেন অনায়াসে।

মিজানুর রহমান মিজান বলেন, দুই-ভাই বোনের মধ্যে আমি ছোট। বড় বোন মরিয়ম আপার বিয়ে হয়ে গেছে। কিছু দিন আগে বিয়ে করেছি। ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। অন্ধত্বের কারণে বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারিনি। এই ব্যবসার শুরুতে কিছুটা সমস্যা হলেও এখন আর কোনো সমস্যা হয় না। গত ৮ বছরে আমার মেধা শক্তি দিয়ে লেনদেনের জন্য বিভিন্ন কোম্পানির ও গ্রাহকের ১০ হাজার মোবাইল নম্বর মুখস্ত করেছি। এখান থেকে দিনে ২/৩শ টাকা আয় হয়। এছাড়া প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। এসব দিয়ে অতিকষ্টে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করছি। অর্থ সংকটে ব্যবসার পুঁজি বৃদ্ধি করতে পারছি না। স্থানীয় এই বাজারে বিনামূল্যে দোকান ঘর করার জন্য সরকারিভাবে হাটের খাস জমি বন্দোবস্ত করে দিলে সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা ফিরত।

স্থানীয় আলামিন মিয়া (৫০) বলেন, আশ্চার্য্যজনক হলেও সত্যি মিজানের দোকানে কেউ একবার ফ্লেক্সিলোড অথবা টাকা লেনদেন করলেই সেই নম্বর মুখস্ত করে ফেলে সে। এলাকার পরিচিত মানুষের সবার মোবাইল নম্বর এবং যারা একবার তার দোকানে লেনদেন করেছে সবার নম্বর বলতে পারে মিজান। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হলেও ব্যবসার সময় যেকোনো নোট চিন্তে ভুল হয় না তার। কেউ ছেড়া অথবা জাল টাকা দিলেও বুঝতে পারে মিজান। চোখে না দেখলেও কোন বাটনে কোন সংখ্যা এটা মোবাইল সেটের ওপর হাত রেখে বলে দিতে পারে।

আশরাফুল ইসলাম (৪৫) বলেন, মিজান টাপুরচর বাজারে একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা করে। গ্রাহকদের সঙ্গে টাকা লেনদেনে কখনো কোনো ঝামেলা হতে দেখিনি। ফ্লেক্সিলোড করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড লাগে তার। মোবাইল নম্বর তার লিখতে হয় না। নিয়মিত মিজানের দোকান থেকেই মোবাইলে লেনদেন করে স্থানীয়রা।

টাপুরচর হাট ইজারাদার মোস্তফা মোর্শেদ বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে বাজারে একটি দোকান ঘরের জন্য সরকারি খাস জমি মিজানকে বন্দোবস্ত করে দেওয়া হবে।

বন্দবেড় ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের বলেন, মিজান একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হয়েও সে সংসার চালাচ্ছে। আমি বাজারের ভেতরে সরকারি জায়গায় ঘর তোলার জন্য বলেছি তাকে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জল কুমার হালদার বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মিজানকে স্বাবলম্বী করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *