আজ চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক:
আজ একুশে পদকপ্রাপ্ত, দেশবরেণ্য ‘চারণ সাংবাদিক’ মোনাজাতউদ্দিনের ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। দিবসটি উপলক্ষ্যে আজ সাংবাদিক সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে রংপুর স্মরণসভা, দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন দৈনিক জনকণ্ঠের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি। পত্রিকার জন্য সরেজমিন প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহে গাইবান্ধায় ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে ফুলছড়ি উপজেলার যমুনা নদীতে কালাসোনার ড্রেজিং পয়েন্ট থেকে ফেরিযোগে নদী পারাপারের সময় পা পিছলে নদীতে পড়ে মৃত্যু বরণ করেন তিনি।

ঘটনার একদিন পর ৩০ ডিসেম্বর রংপুর শহরের মুন্সিপাড়া কবরস্থানে চিরদিনের জন্য শায়িত হয় মোনাজাত উদ্দিনের মরদেহ। মৃত্যুর পর থেকে জনমনে প্রশ্ন জাগলেও এখনও তার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটিত হয়নি। মনে জনমনে শংসয় ‘সত্যি কি তিনি পা পিছলে পড়েছিলেন’ নাকি ‘কোনো ষড়যন্ত্রে মৃত্যু হয় তার’। তার মৃত্যুর একটি তদন্ত কমিটি করা হলেও দীর্ঘ ২৯ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি তদন্ত প্রতিবেদন।

মফস্বল সাংবাদিকতার দিকপাল চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ছিলেন একজন সফল গবেষকও। তার তিন দশকের কর্মজীবনে উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশের পথে-প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে তৃণমুল মানুষের সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। তার লেখনিতে উঠে এসেছিল গ্রাম-বাংলার অজানা অনেক কথা। সততা, ধৈর্য আর অসীম সাহসিকতাকে পুঁজি করে তিনি সাংবাদিকতায় নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

ছাত্র জীবনে বগুড়ার সাপ্তাহিক বুলেটিন পত্রিকার মাধ্যমে তার সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। ১৯৬২ সালে স্থানীয় সংবাদদাতা হিসেবে ঢাকার কাগজ দৈনিক আওয়াজ এবং ১৯৬৬ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। স্বাধীনতার পর তিনি নিজেই দৈনিক রংপুর নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। আর্থিক সমস্যার কারণে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে১৯৭৬ সালে পূর্বদেশ পত্রিকায় যোগ দেন তিনি। এর পর একটানা ২০ বছর কাজ করেন দৈনিক সংবাদে।

প্রায় দেড় যুগ ‘দৈনিক সংবাদ’-এর উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে ১৯৯৫ সালে তিনি দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় যোগ দেন। মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত জনকণ্ঠই ছিল তার ঠিকানা।

তিনি রংপুর শহরের কেরানিপাড়ার বাসা থেকে নানা অভাব-অনটনের মধ্য দিয়েও সাংবাদিকতা চালিয়ে যান। তিনি শুধু সাংবাদিকতায় ব্যস্ত ছিলেন না। ব্যস্ততা ছিল নাটক, গল্প, কবিতা আর ছড়া লেখায়ও। বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘করিম মণ্ডলের বৈঠকখানা’র পাণ্ডুলিপি লেখার পাশাপাশি ভালো গীতিকার হিসেবেও বেশ সুনাম ছিল তার। তার রচিত একমাত্র নাটক ‌‘রাজা কাহিনি’।

এ ছাড়া মৃত্যুর আগে ও পরে মোনাজাতউদ্দিনের লেখা বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশ পায়। এর মধ্যে রয়েছে- সংবাদের নেপথ্য, পথ থেকে পথে, নিজস্ব রিপোর্ট, কাগজে মানুষেরা, নরনারী, শাহ আলম ও মজিবের কাহিনি, পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ, ছোট ছোট গল্প, কানসোনার মুখ, লক্ষ্মীটারী, চিলমারীর এক যুগ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও মোনাজাতের শেষ লেখা ও শেষ দেখা ইত্যাদি।

উত্তরের অহংকার চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ১৯৮৪ সালে সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী স্মৃতি পদক, দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত ‘মানুষ ও সমাজ’ প্রতিবেদনের জন্য বাংলা ১৩৯৩ সালে ফিলিপস পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স পুরস্কার, ১৯৯৫ সালে অশোকা ফেলোশিপ লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে গণমানুষের সাংবাদিক হিসেবে তিনি মরণোত্তর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক লাভ করেন।

মফস্বল সাংবাদিকতায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকা দেশবরেণ্য এই সাংবাদিকের জন্ম হয়েছিল ভাওয়াইয়ার দেশখ্যাত রংপুরের উর্বর ভূমিতে। ১৯৪৫ সালের ১৮ জুন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা মৌলভী আলীম উদ্দীন আহমেদ আর মা মতিজান নেছা।

মোনাজাতউদ্দিন কৈলাশ রঞ্জন স্কুলে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করে ভর্তি হন কারমাইকেল কলেজে। সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ সময় বাবাকে হারিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। পরে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে বিএ পাস করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *