আজ ‘বাবা দিবসে’ প্রতিটি সন্তানের করনীয়

অনলাইন ডেস্ক

বাবা—ছোট্ট একটি শব্দ, কিন্তু এর গভীরতা আকাশসম বিস্তৃত। একজন সন্তানের জীবনে বাবাই হলেন নিরাপত্তার আশ্রয়, সাহসের উৎস, জীবনের প্রথম শিক্ষক এবং পরিবারের নীরব অভিভাবক।

তিনি নিজের স্বপ্ন, আরাম-আয়েশ ও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। অনেক সময় মায়ের ভালোবাসা প্রকাশ্য হলেও বাবার ভালোবাসা থাকে নীরব, গভীর এবং আত্মত্যাগে পরিপূর্ণ।

বিশ্বজুড়ে আজ ‘বাবা দিবস’ পালিত হচ্ছে। যদিও ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন নেই; বরং বছরের প্রতিটি দিন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই তাদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সেবার জন্য নির্ধারিত।

তবুও এই দিনটি আমাদেরকে পিতার অবদান স্মরণ করার, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার এবং নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়।

কোরআনের আলোকে পিতার মর্যাদা
আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারকে নিজের ইবাদতের পরপরই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৩)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর হক আদায়ের পর মানবজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হক হলো পিতা-মাতার হক।

আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৪)
পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাকে আল্লাহ নিজের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, যা তাদের মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

হাদিসে পিতার মর্যাদা
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি তিনবার একই প্রশ্ন করলে তিনবারই তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’
চতুর্থবার তিনি বললেন, ‘অতঃপর তোমার বাবা।

’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৪৮)
এ হাদিসে মায়ের মর্যাদা বিশেষভাবে বর্ণিত হলেও বাবার অধিকার ও সম্মানও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পিতা হলো জান্নাতের মধ্যবর্তী উত্তম দরজাগুলোর একটি।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৯০০)
অর্থাৎ, পিতার সন্তুষ্টি অর্জন জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

পিতার আত্মত্যাগ: এক নীরব সংগ্রামের গল্প
একজন বাবা সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের অগণিত কষ্ট গোপন করেন। সন্তানের শিক্ষার জন্য, চিকিৎসার জন্য, সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেন। সন্তান যখন নিশ্চিন্তে ঘুমায়, তখনও বাবার মনে ঘুরপাক খায় পরিবারের দায়িত্বের চিন্তা। অনেক সময় সন্তান বড় হয়ে বাবার এই আত্মত্যাগ ভুলে যায়। অথচ আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে সে পৃথিবীকে দেখছে, তার পেছনে রয়েছে বাবার ঘাম, পরিশ্রম ও ত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস।

সন্তানের করণীয়
ইসলাম সন্তানের ওপর পিতার প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছে। সেগুলো হলো-
১. পিতার সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা।
২. তাঁর আনুগত্য করা (শরিয়তবিরোধী বিষয় ব্যতীত)।
৩. তাঁর ভরণপোষণ ও সেবাযত্ন করা।
৪. তাঁর জন্য দোয়া করা।
৫. তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের সম্মান করা।
৬. মৃত্যুর পরও তাঁর জন্য সদকা ও ইস্তিগফার করা।


মাতা-পিতার জন্য পঠিতব্য কোরআনে বর্ণিত দোয়া হলো-

   رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا 

উচ্চারণ : ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।’
অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি রহম করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৪)

বাবা দিবসে আমাদের শিক্ষা
বাবা দিবস শুধু সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনার একটি উপলক্ষ। আমরা কি আমাদের বাবার খোঁজ রাখি? আমরা কি তাঁর কষ্ট বুঝি? আমরা কি তাঁর জন্য দোয়া করি? আমরা কি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করছি? যদি উত্তর ইতিবাচক হয়, তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি উত্তর হয় ‘না’ তাহলে আজই পরিবর্তনের সময়। কেননা বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি সন্তানের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। তাঁর ভালোবাসা অনেক সময় শব্দে প্রকাশ পায় না, কিন্তু প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি দায়িত্ব পালন এবং প্রতিটি দুশ্চিন্তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সন্তানের প্রতি গভীর মমতা।

তাই বাবা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—শুধু একটি দিনের শুভেচ্ছায় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি দিনে বাবার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব। তাঁর সেবাকে ইবাদত মনে করব, তাঁর সন্তুষ্টিকে জান্নাতের পথ হিসেবে গ্রহণ করব এবং তাঁর জন্য সর্বদা দোয়া করব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল পিতা-মাতাকে সুস্থতা, বরকত ও দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন এবং যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com