১২ বছরের শিশুকে ৬৫ বছরের বৃদ্ধের সঙ্গে বিয়ে

অনলাইন ডেস্ক

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ৬৫ বছরের এক বৃদ্ধের ধর্ষণের শিকার হয়ে ১২ বছরের শিশুর পেটে এখন বড় হচ্ছে পাঁচ মাসের আরেকটি শিশু। ঘটনাটি আপস মীমাংসায় ধামাচাপা দিতে স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে শিশুটির সঙ্গে অভিযুক্ত বৃদ্ধের কথিত বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এরই মধ্যে ১২ বছরের অন্তঃসত্ত্বা ওই শিশুটিকে দেড় লাখ টাকার দেনমোহর ও দুই শতক জমি লিখে দেওয়ার আশ্বাসে একটি গোপন আপস-মীমাংসার মাধ্যমে ওই শিশুটিকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে ওই ধর্ষক ব্যক্তির সঙ্গে। এসব যা কিছু করা হচ্ছে তার সবটাই শিশুটির পরিবারকে চাপের মধ্যে ফেলে করা হচ্ছে। তবে শিশুটিসহ তার পরিবার ধর্ষকের উপযুক্ত বিচার চান।

বৃহস্পতিবার (০৭ মে) বিকেলে ধর্ষণের শিকার অন্তঃসত্ত্বা ওই শিশুর বাড়িতে যাওয়া হলে এগিয়ে আসেন প্রতিবেশীরা। তবে সংবাদকর্মী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে পরিবারসহ পালিয়ে যায় অভিযুক্ত।

পরিবার ও স্থানীয়রা জানায়, গত ৬ মাস আগে শীতকালীন সময়ে নানির জন্য দোকানে পান আনতে গিয়েছিল শিশুটি। পথিমধ্যে একই এলাকার নূর ইসলাম নামের এক ব্যক্তি শিশুটিকে মুখ চেপে ধরে পার্শ্ববর্তী ভুট্টা ক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে বিষয়টি কাউকে জানালে তাকে হত্যা করা হবে বলে শিশুটিকে হুমকি দেয় ওই ধর্ষক। এরপর আরও কয়েকবার শিশুটিকে ধর্ষণ করে ওই বৃদ্ধ।

এক মাস আগে শিশুটির চেহারায় অস্বাভাবিকতা লক্ষ করে শিশুটির মামি। পরে পরীক্ষা করে দেখেন যে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা। এরপর শিশুটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব ঘটনা খুলে বলে।

এ ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে সপ্তাহখানেক আগে স্থানীয়দের মাধ্যমে মীমাংসার নামে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়। ৬৫ বছরের অভিযুক্তের সঙ্গে বিয়েও দেওয়া হয়েছে অন্তঃসত্ত্বা ওই শিশুটিকে। একটি খাতায় ওই শিশুর সই-স্বাক্ষর নিয়ে বলা হয় বিয়ে হয়ে গেছে। বিনিময়ে দেড় লাখ টাকা মোহরানা ও দুই শতক জমি লিখে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অভিযুক্ত।

এই ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত নূর ইসলামের বাড়িতে যাওয়া হলে তার বাড়িতে তালা দেখতে পাওয়া যায়। এলাকাবাসী জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকেলেই বাড়ি থেকে স্ত্রী-সন্তান সবাই মিলে পালিয়ে গেছে। এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এলাকাবাসী।

কথা হলে ওই শিশুটি বলে, ‘আমি সন্ধ্যায় পান কিনতে যাই। এ সময় হঠাৎ করে এসে মুখ চেপে ধরে আমাকে চিৎকার করতে দেয়নি। পরে আমার সঙ্গে খারাপ কাজ করে। এরপর এ বিষয়ে আমি কাউকেই কিছু বলিনি। আমার পেটের ভিতর কি যেন থলবল (নড়াচড়া) করে। খেতে গেলে বমি বমি লাগে। গত মাসে ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেন এখন পাঁচ মাস হয়েছে। বর্তমানে আমার কোনো চিকিৎসা চলছে না। আমি এর বিচার চাই। যেদিন মীমাংসা হয় সেদিন আমাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার মতামত নেওয়া হয়নি। আমি তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে চাই না। ভূমিষ্ঠ হলে আমি তাকে সন্তানটি ফেরত দিয়ে চলে আসব, তালাক দিব।

মেয়ের মামি বলেন, মেয়েটির স্বভাব দেখে আমার কিছুটা অদ্ভুত লাগে। এরপর আমি একদিন বুঝতে পারি সে গর্ভবতী। পরবর্তীতে এলাকায় জানাজানি হলে এলাকার সবাই মিলে এ বিষয়টি সমাধান করে। সেসময় আমি সেখানে ছিলাম না। আমাদের কাউকে জানানো হয়নি।

মেয়ের মা বলেন, এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা ও দুই শতক জমি দিতে চয়েছে আমাদের। টাকা এবং জমি কিছু পাইনি এখনো। এখন জমি দিয়ে আমার মেয়ে ভবিষ্যতে কিছু করে খেতে পারবে। এই ঘটনা হওয়ার পর গ্রামের সবাই মিলে দুজনের বিয়ে দেয়।

মেয়ের বাবা বলেন, হঠাৎ করেই আমি জানতে পারি আমার মেয়ে পাঁচ মাস গর্ভবতী। আমি অনেক চিন্তাভাবনা করে দেখলাম আমার মেয়ের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ওই লোকের সঙ্গেই আমার মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। আমার আর কিছু করার নেই। আমি ভালোভাবে চলাচল করতে পারি না। এর মধ্যে শুধু একবার চেকআপ করা হয়েছিল। চেকআপ করে দেখা যায়, আমার মেয়ে পাঁচ মাসের গর্ভবতী। ওই লোকের বয়স ৬০ থেকে ৬৫-এর মধ্যে, যা আমার বয়সের থেকেও বেশি। আমি তো চলাফেরা করতে পারি না, আমি সংসার চালাব কীভাবে— এই চিন্তা করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।

ফুলবাড়ী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নব কুমার বিশ্বাস বলেন, ঘটনাটি শীতের সময়। ১২ বছর শিশুকে ফুসলিয়ে ৬৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ধর্ষণ করেন। পরে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হলে বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে লোকলজ্জার ভয়ে এবং মেয়েকে দেড় লাখ টাকা ও ২ শতক জমি লিখে দেওয়ার কথা বলে কাজী ডেকে বিয়ের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কথা না রাখায় বিষয়টি জানাজানি হয়। পরিবারের সদস্যরা আমাদের সব ঘটনা বলেছেন।

তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হবে। মামলা হওয়ার পর তদন্ত সাপেক্ষে যার যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, তাদের সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com