ডেস্ক রিপোর্ট
রক্তস্নাত জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম, দীর্ঘ দেড় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) উদিত হতে যাচ্ছে এক নতুন সূর্য। ভোটাধিকারবঞ্চিত কোটি মানুষের দীর্ঘ আক্ষেপ ঘুচিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত সাংবিধানিক গণভোট’। ফ্যাসিবাদের পতনের পর আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে— তা ব্যালটের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে উন্মুখ হয়ে আছে গোটা জাতি।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে তরুণ প্রজন্ম। মোট ভোটারের প্রায় ৪৫ শতাংশ ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ। এছাড়া, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা।
শুরু হচ্ছে ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থীর ভোটযুদ্ধ
সংসদ ভোটে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে (শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুতে ভোট স্থগিত)। এ নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী ভোটযুদ্ধে লড়ছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন।
সংসদ ভোট ও গণভোটে নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতার নির্দেশ
মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন। এবারের নির্বাচনে সারাদেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ঝুঁকি সামলাতে নির্বাচন কমিশন নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
মোট ভোটার ১২ কোটি, এগিয়ে পুরুষরা
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, চলতি বছর তিনবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে ভোটেরযোগ্য মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।
এই বিশাল ভোটারকে সামলাতে ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ করেছে ইসি। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন, পোলিং অফিসার ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন। আর ভোটারদের ভোট নিতে ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন দায়িত্ব পালন করবেন।
ইসি জানিয়েছে, আগামীকালের সংসদ ভোটে সেনাবাহিনী (১ লাখ ৩ হাজার), পুলিশ (১ লাখ ৮৭ হাজার), আনসার (৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন), বিজিবি (৩৭ হাজার ৪৫৩), নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র্যাব, কোস্টগার্ড ও বিএনসিসি মিলিয়ে মোট ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এবার নির্বাচনে সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ ভোটের মাঠে দায়িত্ব পালন করছে।
ভোটের মাঠে ৫৪০ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে বাংলাদেশে এসেছেন ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জনসহ কমনওয়েলথ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি রয়েছেন। আল জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স ও এপির মতো নামকরা প্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।
জরাজীর্ণ ভোটকেন্দ্র সংস্কারে ২ স্তরের তদারকি কমিটি, ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, নির্বাচন আয়োজনে কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো এবং সন্তোষজনক। তবে, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এ পর্যন্ত ৩০০টি মামলা দায়ের এবং ৫০০টিরও বেশি তদন্ত করা হয়েছে। এছাড়া ১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। দুষ্টচক্র সহিংসতা ঘটাতে চাইলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। কুমিল্লা, যশোর ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান তারই প্রমাণ।
ফিরে দেখা নির্বাচনী ইতিহাস
স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন জয় পায় আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে ১১টি আসনে দলটির প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৪টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নেয়। বিরোধীদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় লীগ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল একজন করে এবং স্বতন্ত্র পাঁচজন প্রার্থী বিজয়ী হন। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫৫.৬১ শতাংশ। এই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর ছয় মাস।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপির নামক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের অধীনে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ ২৯টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫১.২৯ শতাংশ। এতে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। বাকি ৯৩ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি, জাতীয় লীগ দুটি, আওয়ামী লীগ (মিজান) দুটি, জাসদ আটটি, মুসলিম ও ডেমোক্রেটিক লীগ ২০টি, ন্যাপ একটি, বাংলাদেশ গণফ্রন্ট দুটি, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল একটি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দল একটি এবং জাতীয় একতা পার্টি একটি আসনে জয়ী হয়। ১৬টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল তিন বছর।
১৯৮৬ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির অধীনে তৃতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিলেও প্রথমবারের মতো ভোট বর্জন করে বিএনপি। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। ভোটের হার ছিল ৬৬.৩১ শতাংশ। অংশ নেয় ২৮টি রাজনৈতিক দল। জাতীয় পার্টি বাদে অন্য দলগুলো পায় ১১৫টি আসন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৭৬টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) পাঁচটি, ন্যাপ (মোজাফফর) দুটি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পাঁচটি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) তিনটি, জাসদ (রব) চারটি, জাসদ (সিরাজ) তিনটি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ১০টি, মুসলিম লীগ চারটি এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি তিনটি আসন পায়। বাকি ৩২টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল ১৭ মাস।
১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব চতুর্থ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলই বর্জন করে। নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে এরশাদের দল জাতীয় পার্টি। পরে ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় এরশাদ। এ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫১.৮১ শতাংশ। জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। নির্বাচনে আটটি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। ১৯টি আসন পেয়ে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেন সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ)। এছাড়া জাসদ (সিরাজ) তিনটি ও ফ্রিডম পার্টি দুটি আসনে জয় পায়। বাকি ২৫টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস।
এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ৭৫টি দল অংশ নেয়। এ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫৫.৪৫ শতাংশ। বিএনপি ১৪০টি আসনে জয় পায়। আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) পাঁচটি, জাসদ (সিরাজ) একটি, ইসলামী ঐক্যজোট একটি, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, সিপিবি পাঁচটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি একটি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) একটি, গণতন্ত্রী পার্টি একটি ও ন্যাপ (মোজাফফর) একটি আসন পায়। বাকি তিনটি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। পরে বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট ক্ষমতা যায়। আর আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকে। সংসদের মেয়াদ ছিল চার বছর আট মাস।















Leave a Reply